সৌরভ একসময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতেন। চোখে ছিল স্বপ্ন, কণ্ঠে ছিল প্রতিবাদের জোর। কিন্তু হঠাৎ উড়ে আসা কতগুলো বুলেটের গুলি তার জীবন তছনছ করে দেয়। সৌরভ আজও সেই বুলেটের ক্ষত বহন করে চলেছেন, শুধু শরীরে নয়—মনেও। অসহিষ্ণুতা, ঘুমের ব্যাঘাত, হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা, অল্প শব্দেই চমকে ওঠা – সৌরভ এখনও মানসিকভাবে স্বাভাবিক হতে পারেননি। একসময় যিনি অন্যদের সাহস জোগাতেন, আজ নিজেই লড়ছেন এক অদৃশ্য যন্ত্রণার সঙ্গে।
সৌরভ একা নন। জান্নাত, রাকিব, জুনায়েদ, সালেহ, জিসান—তারা সবাই একই যন্ত্রণার সঙ্গী।বুলেট কারো চোখে লেগেছে , কারো আবার পায়ে লেগে কেটে ফেলতে হয়েছে একাংশ, কেউ শরীরের গভীরে ধারণ করছে লুকিয়ে থাকা বুলেট। শারীরিক ক্ষত শুকিয়ে গেলেও দিনেদিনে মানসিক ক্ষত গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।
তাদের এই মানসিক অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সফরন ফাউন্ডেশন ও সংযোগ ফাউন্ডেশন আয়োজন করে ‘নির্বাণ’ কর্মশালা। গত বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ব্র্যাক সেন্টার, মহাখালীতে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় আলোচকরা আন্দোলনকারীদের মানসিক সুস্থতা, আত্ম-পরিচর্যা ও পুনর্বাসনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধারা, যারা নিজেদের সাহস ও আত্মত্যাগ দিয়ে ন্যায়ভিত্তিক সমাজের ভিত্তি গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজপথের লড়াই শেষ হলেও মানসিক যুদ্ধ এখনো চলছে।
আলোচনায় গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক এবং তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ, শাশা ডেনিমসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর শামস মাহমুদ। সফরন ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারপার্সন সৌমিক দত্ত এবং সংযোগ ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার ইমতিয়াজ আহমেদ তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
বক্তাদের কথায় উঠে এসেছিল কিভাবে জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের আত্মত্যাগ পুরো দেশের মানুষকে সাহস দিয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তরুণরা যে আগের প্রজন্ম নিয়ে আরও মুক্তভাবে চিন্তা করছে সে বিষয়টিও উঠে এসেছে অতিথিদের আলোচনায়। অতিথরা এবং কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা একটি বিষয়ে একমত হয়েছেন, নিজেদের মধ্যে যত ব্যবধানই থাকুক না কেন দেশের জন্য এবং নিজেদের প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সমাজের অসংগতি এবং সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে।
কর্মশালায় মনোবিজ্ঞনী ও মনোচিকিৎসকগণ দিনব্যাপী সর্বাধুনিক মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে জুলাই অভ্যুথানে অংশগ্রহণকারীদের আত্নযত্ন নেয়ার পদ্ধতি শিখন ও তাদের মানসিক শক্তিকে দৃঢ়করণে লক্ষ্যে অংশগ্রহণমূলক সেশন পরিচালনা করেন।প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন হেলথ ইকুইটি ইনিশিয়েটিভ (হেই) মালয়েশিয়ার ক্লিনিক্যাল সুপারভাইজর জোহরা পারভীন এবং ইউএস-বাংলা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আজিজুল ইসলাম। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ড. ইমদাদুল হক তালুকদার এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক রাইহানা শারমিন সম্পুর্ন কর্মশালাটি পরিচালনা ও সঞ্চালনা করেন।
‘নির্বাণ’ কর্মশালার স্ট্রাটেজিক পার্টনার ছিল গণসাক্ষরতা অভিযান এবং ইভেন্ট পার্টনার ছিল কগনিটিভলি ইউরস। কর্মশালায় আলোচকরা গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধাদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে সহায়ক কৌশল, বহু-অংশীদারি উদ্যোগ, ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
আয়োজকদের মতে, বৈষম্যমুক্ত ও শোষণহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে আত্মত্যাগী তরুণদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করাই এই কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য। তাদের জন্য এমন সহায়তা ও পুনর্বাসনমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে, যেন তারা আবারও স্বপ্ন দেখতে পারে, গড়ে তুলতে পারে এক নতুন বাংলাদেশ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন প্রযুক্তি সহায়তায়: ইয়োলো হোস্ট